বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু : মাস্ক পরার বিকল্প নেই

অনলাইন ডেস্ক, আমাদের ভোলা।

নভেল করোনাভাইরাসে ২৪ ঘণ্টায় আরো ২ হাজার ২১২ জনের শরীরে নতুন সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যা গত ৭৬ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গতকাল মঙ্গলবার একই সময়ে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত ৫৭ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক। একই সময়ে বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরো ১ হাজার ৭৪৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে। এতে সুস্থ রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮৯৫ জন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে পাঠানো নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।

এদিকে গত এক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা ২৫ জন ছাড়ায়নি কখনোই। তবে মঙ্গলবারই মৃত্যুর সংখ্যায় এই বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেল। বিশেষজ্ঞ বলছেন, শীতে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ানো করোনা বেশি মানুষকে আক্রান্ত করছে। শনাক্ত সংখ্যা বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে জন্মস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, মানুষ এখন আর মাস্ক পরে না, স্বাস্থ্যবিধিও মানছে না। তাছাড়া শীতে বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এতে উপসর্গহীন করোনা আক্রান্ত এক-দুইজন থাকলে অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, শীতে শনাক্ত সংখ্যা বাড়লেও টেস্ট বাড়ছে না, তাছাড়া তৃণমূলে র‌্যাপিড করোনা টেস্ট বাড়াতে হবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘এখনো অনেক মানুষ আছে যারা করোনা পরীক্ষা করানোর জন্য আসছে না। এদের মধ্যে স্বল্প আয়ের মানুষ, দরিদ্র ও চাকরিজীবীই বেশি। তারা জানেন, রোগ ধরা পড়লে তাকে ১৪ দিন ঘরে বন্দি থাকতে হবে, আইসোলেশনে থাকতে হবে। এতে তার উপার্জন বন্ধ হয়ে যাবে, চাকরিচ্যুতির ভয় আছে; তাতে পারিবারিক অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাবে।’ এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘সাপোর্টিভ আইসোলেশনের’ ব্যবস্থা করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, মনে রাখা দরকার, সংক্রমণ কম হলে, মৃত্যুর সংখ্যাও কমে আসবে।

গতকালের ৩৯ জনের মৃত্যুতে দেশে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ২৫৪ জন। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর এর চেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; সেদিন মৃত্যু হয়েছিল ৪০ জনের। এছাড়া নতুন ২ হাজার ২১২ জনকে নিয়ে দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৪ জন হয়েছে। গতকালের চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের খবর সর্বশেষ এসেছিল গত ২ সেপ্টেম্বর; সেদিন ২ হাজার ৫৮২ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার খবর জানানো হয়েছিল। গত কয়েক মাস ধরে নতুন রোগী শনাক্তের হার ১১ শতাংশের ঘরে থাকলেও এখন শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.৮৩।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে ২৪তম স্থানে আছে বাংলাদেশ, আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৩২তম অবস্থানে। বিশ্বে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এরই মধ্যে সাড়ে ৫ কোটি পেরিয়ে গেছে; মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১৩ লাখ ২৮ হাজারের ঘরে।

দেশে করোনা প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে গত ৮ মার্চ। গত ২৬ অক্টোবর এই সংখ্যা ৪ লাখ পেরিয়ে যায়। এর মধ্যে গত ২ জুলাই ৪ হাজার ১৯ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ শনাক্ত। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ৪ নভেম্বর তা ৬ হাজার ছাড়ায়। এর মধ্যে ৩০ জুন এক দিনেই ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ মৃত্যু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১১৭টি ল্যাবে ১৫ হাজার ৯৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৯৫২টি নমুনা। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ, এ পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি ও ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, গত এক দিনে যারা মারা যাওয়া ৩৯ জনের মধ্যে ৩০ জন পুরুষ আর নারী ৯ জন। তাদের সবাই হাসপাতালে মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে ২৪ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি ও ১০ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। দেশে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৬ হাজার ২৫৪ জনের মধ্যে ৪ হাজার ৮১৩ জনই পুরুষ এবং ১ হাজার ৪৪১ জন নারী। দেশে মোট মৃতদের মধ্যে ৩ হাজার ২৯০ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এছাড়াও ১ হাজার ৬৪২ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ৭৬৮ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। বাকিদের বয়স ৪০ বছরের নিচে। দেশে সর্বোচ্চ মারা গেছেন ঢাকা বিভাগে ৩ হাজার ২৮৩ জন, দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চট্টগ্রাম বিভাগ ১ হাজার ২২৩ জন।

বাংলাদেশে মার্চ মাসে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। মে, জুন, জুলাই মাস নাগাদ প্রতিদিন ৪ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত আর ৩০-৪০ জনের মৃত্যুর ঘটনা দেখা যায়। তবে পরবর্তীতে তা কমে আসে। কিন্তু শীতের সময়ে করোনাভাইরাসের আরেক দফা সংক্রমণ দেখা দিতে পারে বলে বেশ কিছুদিন ধরে সতর্ক করে দিচ্ছেন স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা। এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশে শীতকালে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়বে।

এদিকে শীতপ্রধান অনেক দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করায় পুনরায় লকডাউন ও কড়াকড়ি আরোপ করার ঘটনাও ঘটেছে। দেশেও শীতল আবহাওয়া দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী এ বিষয়ে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বাতাসের তুলনায় ওজনে করোনাভাইরাস অনেক হালকা। তাই শীতে বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেলে হাঁচি-কাশির সঙ্গে থাকা পানিটুকু শুষে নেয়, বাতাসে ভাসতে থাকে শুধু ভাইরাস। ফলে এটা উড়ে গিয়ে অনেক বেশি লোককে আক্রান্ত করে।

হঠাৎ শনাক্ত সংখ্যা বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা লক্ষ্য করছি, গত ৭ থেকে ১৫ দিন ধরেই রোগী সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল প্রকাশিত সংখ্যাটি আসলে সরকারি পরিসংখ্যান। শনাক্তের জন্য এই নমুনা অন্তত ৩ থেকে ১০ দিন আগে নেওয়া হয়েছিল। সুতরাং আজ (মঙ্গলবার) রোগীর কত তা জানা যাবে আরো পরে। এর মধ্যে মানুষ সচেতন না হলে সংক্রামণ আরো বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, আমরা মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলতে বলতে ক্লান্ত, মানুষ মাস্ক ব্যবহার করতে করতে ক্লান্ত, কিন্তু করোনাভাইরাস একটুও ক্লান্ত হয়নি। বরং প্রতিনিয়ত রূপ বদলে শক্তিশালী হচ্ছে। তাই আমাদের মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই। এর পক্ষে প্রচারণা ও অভিযান বৃদ্ধি করতে হবে। সেই সঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠান ও সমাগম কমাতে হবে।

করোনাভাইরাস আক্রান্তের শনাক্ত বৃদ্ধি প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, বিভিন্ন স্থানের হাসপাতাল থেকে তথ্য আসার দেরি হওয়ার কারণে হঠাৎ করোনাভাইরাসে সংক্রামণ শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে। এই সংখ্যা গড়ে টানা তিন দিন বা এক সপ্তাহ না থাকলে বৃদ্ধি পেয়েছে এই সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। মনে রাখা দরকার সংক্রামণ কম হলে মৃত্যুর সংখ্যাও কমে আসবে।

‘সাপোর্টিভ আইসোলেশন’ চালু করা প্রসঙ্গে ভাইরোলজিস্ট ডা. মুশতাক বলেন, রোগ শনাক্ত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আক্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তাদের খাদ্য সহায়তার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংগঠন, প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে টেস্টের পরিমাণ বাড়বে। এটা একটা সামাজিক আন্দোলন হিসেবে নিতে হবে। আইন করে বা ভয় দেখিয়ে মানুষকে মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাবে না। এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, যারা সক্ষম তাদের আগে স্বাস্থ্যবিধি মানা বাধ্য করতে হবে। যারা সক্ষম নয় তাদের সক্ষম করে তুলতে হবে। দরিদ্র ও শ্রমজীবীদের চাল কেনার পয়সা নিয়ে টানাটানি, তারা পকেটের পয়সা দিয়ে মাস্ক কিনবে না। তাদের প্রথমে দিতে হবে। তারা যখন বুঝবে, এটা তাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অংশ, তখন তারাই গামছা বা নারীরা শাড়ির আঁচলকে মাস্ক হিসেবে ব্যবহার করবে।

আগের অভিজ্ঞতায় ক্রমবর্ধমান করোনা রোগীর চিকিৎসা সক্ষমতা প্রসঙ্গে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আগে চিকিৎসা দেওয়া হলেও এখন ঢাকা অধিকাংশ বিশেষায়িত হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা বন্ধ। সেগুলো আবার চালু করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু জেলা-উপজেলা পর্যায় আইসিইউ বৃদ্ধি করে লাভ নেই, তা পরিচালনার জন্য লোকবলের অভাব আছে। তাই যেখানে ভেন্টিলেশন ও আইসিইউ ব্যবস্থাসহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আছে সেখানে আইসিইউ বেড বাড়িয়ে দিলে কম লোকবল দিয়েই অনেক বেশি মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তাছাড়া জুনিয়র ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আইসিইউ পরিচালনায় দক্ষ করে তোলা সম্ভব। দ্রুত করতে হবে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আর্কাইভ

নভেম্বর ২০২০
শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
« অক্টোবর  
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০ 

সর্বমোট ভিজিটর

counter
এই সাইটের কোন লেখা অনুমতি ছাড়া কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ!