নির্বাচনকে ঘিরে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র

অনলাইন ডেস্ক, আমাদের ভোলা।

ট্রাম্প যে ৩ নভেম্বর থেকেই বলছেন যে তিনিই বিজয়ী এবং পরাজয় মেনে নেবেন না, সেটা বিস্ময়কর নয়; কেননা নির্বাচনের সময় একাধিকবার তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নিশ্চয়তা তিনি দেবেন না। এখন তিনি শেষ চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং প্রচলিত কোনো রকমের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না বলে এই অবস্থান থেকে তিনি সরে আসবেন এমন মনে করার কারণ নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, ভোটের হিসাব যখন তাঁর বিরুদ্ধে, তাঁর কট্টর সমর্থকেরা ছাড়া যখন তাঁর পাশে সরবভাবে কেউ নেই, এমনকি তাঁর প্রিয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ফক্স টেলিভিশনের হিসাবেও তাঁর পরাজয় নিশ্চিত, সেই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প কিসের ভরসায়, কী পরিস্থিতির আশায় এখনো গোয়ার্তুমি করছেন?

যদিও তাঁর এই সব কথাকে কমবেশি এক ধরনের উন্মাদনা বলেই মনে হচ্ছে, কিন্তু ভালো করে হিসাব করলে দেখা যাবে যে এটা নেহাতই পাগলামি নয়। বরঞ্চ ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সাংবিধানিক সংকটে ফেলতে চাইছেন; দেশের গণতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিতে চাইছেন।

হোয়াইট হাউসের সিএনএন রিপোর্টার জানাচ্ছেন যে কর্মচারী ও ট্রাম্পের পরামর্শকেরা এ কথা বুঝতে পারছেন যে পরাজয় অবধারিত, কিন্তু ট্রাম্পের আচরণে এই অবধারিত ভবিষ্যৎ মেনে নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই, বরঞ্চ তিনি আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তিনি কী করতে পারেন, তাঁর এই আশার ভিত্তি কী, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র সাংবিধানিক সংকটে পড়তে পারে?
প্রথমত, ট্রাম্প যেটা করতে পারেন সেটা হচ্ছে আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোট গণনা এবং ফল চ্যালেঞ্জ করে মামলা করতে পারেন। ট্রাম্পের প্রচার দল এবং তাঁর আইনজীবীরা সেটা ইতিমধ্যেই করতে শুরু করছেন। তাঁর পুত্র এরিক ট্রাম্প এবং তাঁর আইনজীবী রডি জুলিয়ানি বেশ কয়েকটি রাজ্যে এই ধরনের মামলা করেছেন, কিন্তু এই সব মামলায় তাঁরা এখন পর্যন্ত সুবিধা করতে পারেননি। অধিকাংশ মামলা রাজ্য পর্যায়ের আদালতেই নাকচ হয়ে যাচ্ছে, তার কারণ হচ্ছে প্রমাণের অভাব।

কিন্তু ট্রাম্পের আশা হচ্ছে তিনি সুপ্রিম কোর্টে যাবেন, ৩ নভেম্বর রাতেই তিনি সেটা বলেছেন। যেকোনো বিষয় নিয়ে চাইলেই কেউ সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হতে পারেন না। যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ার সূচনা হতে হবে রাজ্যের আদালতে, তারপর তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার পথ তৈরি হয়।

কিন্তু ট্রাম্প ভরসা করছেন একটি মামলার ওপর, যাকে উপলক্ষ করে তিনি সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারেন। এই মামলা হচ্ছে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ডাকযোগে ভোটসংক্রান্ত। ২৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট পেনসিলভানিয়ার ডাকযোগে ভোটবিষয়ক একটি রায় দেন। তাতে বলা হয়েছিল যে ডাকযোগে ভোট যদি ৩ তারিখে পোস্ট-মার্ক হয়, তবে নির্বাচনের তিন দিন পরে অর্থাৎ ৬ তারিখ পর্যন্ত তা গ্রহণ করা যাবে এবং গণনা করা যাবে।

আসলে এই রায় ছিল পেনসিলভানিয়া রাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের, কিন্তু রিপাবলিকানরা তাঁর বিরুদ্ধে আপিল করতে ফেডারেল সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন। আদালত তাঁদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। কিন্তু এই বিষয়ে আদালতের অর্ডারের সঙ্গে তিনজন বিচারক তাঁদের মতামত দিয়েছেন, তাঁরা হচ্ছেন থমাস ক্ল্যারেন্স, স্যামুয়েল আলিটো এবং নিল গরসিচ। তাঁরা বলেছেন যে দরকার হলে তাঁরা নির্বাচনের পরে এই বিষয়টি আবার বিবেচনা করবেন। যে কারণে পেনসিলভানিয়া ৩ তারিখের পরে আসা ভোট আলাদা করে রাখবে। এটাই হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার অন্যতম পথ। ইতিমধ্যেই রিপবালিকান দলের আইনজীবীরা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু এই রাজ্যে ভোটের ব্যবধান কম নয়, সেহেতু এই মামলা আদৌ কোনো কাজে দেবে এমন মনে হয় না।

আদালতের বাইরেও কিন্তু ভিন্ন পথ আছে, যা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করতে পারে। (এ বিষয়ে আমার আগের আলোচনা দেখুন ‘কী অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে’ প্রথম আলো, ১৪ অক্টোবর ২০২০)। এই প্রক্রিয়া বোঝার জন্য আমাদের ভোট গণনার পরে কী হবে, সেই তারিখগুলো মনে রাখতে হবে। ভোট গণনার পরে প্রতিটি রাজ্যের গভর্নরকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সাতটি সত্যায়ন সার্টিফিকেশন করতে হবে; ২ ডিসেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ইলেক্টরদের তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে, যা করবে রাজ্যের আইনসভা; ৮ ডিসেম্বর প্রতিটি রাজ্যের রাজধানীতে মিলিত হয়ে ইলেক্টররা দুটি আলাদা ব্যালটে প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের ভোট দেবেন, এই ইলেক্টররা ছয়টি ভোটের সার্টিফিকেট এবং ছয়টি সত্যায়নের সার্টিফিকেট সই করবেন। ছয় সেট তাঁরা স্বাক্ষর করবেন।

এই সব ভোট ২৩ ডিসেম্বর পৌঁছাতে হবে জাতীয় আর্কাইভের আর্কাইভিস্টের কাছে, যা আর্কাইভিস্ট সিনেট সভাপতির কাছে হস্তান্তর করবেন; ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স হচ্ছেন সিনেটের প্রেসিডেন্ট। ৩ জানুয়ারির মধ্যে এই সব ভোটের কাগজ পৌঁছে দিতে হবে কংগ্রেসের কাছে, নতুন কংগ্রেসের মেয়াদ শুরু হবে ওই দিন। ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসের যৌথ সভা হবে সিনেট প্রেসিডেন্টের সভাপতিত্বে, যেখানে এই ভোট গণনা করা হবে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা করা হবে। এই প্রক্রিয়ার তিনটি জায়গা আছে যেখানে পুরো পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে বা সাংবিধানিক সংকটের সূচনা হতে পারে।

প্রথমত, ইলেক্টর নির্বাচন। যেকোনো রাজ্যে গভর্নর বা আইনসভা চাইলে তাদের পছন্দমতো ইলেক্টর নিয়োগ দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে রিপাবলিকান গভর্নররা বা আইনসভা যদি ভিন্নমত পোষণ করে, তবে দুটি তালিকা তৈরি হবে। পেনসিলভানিয়া, উইসকনসিন, মিশিগান—এই তিন রাজ্যে এই আশঙ্কা আছে। এই অবস্থায় বিতর্কের সূচনা হবে কারা ১৪ তারিখে ভোট দেবেন, কাদের ভোট যাবে ওয়াশিংটনে। দুটি ভোটের তালিকা যাবে কংগ্রেসের কাছে।

দ্বিতীয় জায়গা হচ্ছে যখন কংগ্রেসে ভোট গণনা হবে তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট একই রাজ্যের দুই তালিকার দুটোই বাদ দিতে চেষ্টা করতে পারেন। তাতে করে তৈরি হবে বিশৃঙ্খল অবস্থা। এই বিশৃঙ্খলার পরিণতি কী হবে, আমরা তা জানি না। কিন্তু তা যে সাংবিধানিক সংকট তৈরি করবে, সেটা নিশ্চিত।

তৃতীয় জায়গা হচ্ছে আপত্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফেলা। এই ক্ষেত্রে একজন হাউস সদস্য এবং একজন সিনেট সদস্য একত্র হয়ে যেকোনো ইলেক্টরের বা কোনো রাজ্যের ভোটের ব্যাপারে আপত্তি তুলতে পারেন। সেটা হলে সেই আপত্তি নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে সিনেট ও হাউস মিলিত হয়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। যদি দুই কক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হয় তবেই এই ধরনের আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে। এই মুহূর্তে সেই ধরনের সম্ভাবনা নেই।

এই সব পথে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে দেশ এক ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। এই ধরনের সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র কেবল আন্তর্জাতিকভাবেই হাসি–তামাশার বিষয়ে পরিণত হবে তা নয়, অভ্যন্তরীণভাবেও সংঘাত–সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।

কিন্তু যদি এইভাবে কোনো প্রার্থী ২৭০টি ভোট না পান তবে নির্বাচনের দায়িত্ব পড়বে কংগ্রেসের ওপরে। হাউস সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচন করবে প্রেসিডেন্ট, সিনেট করবে ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু হাউসে ভোটের পদ্ধতি হচ্ছে এক রাজ্য এক ভোট। যে রাজ্যের বেশি প্রতিনিধি যেই দলের সেই ভোট দেওয়ার অধিকার পাবে।

এই হিসাবে হাউসে ডেমোক্র্যাটদের ভোট থাকবে ২১ থেকে ২৪টি, রিপাবলিকানদের ২৬টি। তার অর্থ হচ্ছে রিপাবলিকানদের প্রার্থী ট্রাম্প বিজয়ী হবেন। সিনেটেও ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যালঘু। এই ধরনের পরিস্থিতি কষ্ট-কল্পিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে এই পর্যন্ত তিনবার এই রকম ঘটেছে, ১৮০১, ১৮২৫ এবং ১৮৭৭ সালে।

এই ধরনের একটি সিনারিও হলে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি যা করতে পারেন তা হচ্ছে কংগ্রেসের বৈঠকে সদস্যদের উপস্থিতিতে বাধা দিতে পারেন। কেননা সংবিধান বলে যে এই ভোট গণনার সময়ে সদস্যদের উপস্থিত থাকতে হবে। যদি এই প্রক্রিয়া ২০ জানুয়ারি দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে পারেন, অর্থাৎ যদি হাউস কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে না পারে এবং সিনেট ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে না পারে, তবে স্পিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাময়িকভাবে দায়িত্ব নেবেন।

সংবিধানের এই সব বিধান রাখা হয়েছে যেন কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা না দেয়। কিন্তু এই সব পথে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে দেশ এক ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। এই ধরনের সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র কেবল আন্তর্জাতিকভাবেই হাসি–তামাশার বিষয়ে পরিণত হবে তা নয়, অভ্যন্তরীণভাবেও সংঘাত–সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ট্রাম্পের সমর্থকেরা এই ধরনের সাংবিধানিক সমাধানের জন্য ধৈর্য ধরতে পারবেন না, তাঁরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালাবেন এবং সশস্ত্রভাবে অন্যদের ভয় দেখাতে চাইবেন; অন্যদিকে নাগরিকদের ভোটের রায়কে অবজ্ঞা করার জন্য বাইডেন–সমর্থক এবং নাগরিক অধিকারের সংগঠকেরাও প্রতিবাদ করবেন।

এই সব সংকটের বিভিন্ন চিত্র বিবেচনা করার পাশাপাশি আমাদের যেটা মনে রাখা দরকার তা হচ্ছে সংবিধানে সুস্পষ্ট করেই বলা আছে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি দুপুরে বর্তমান প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হবে। ২০ জানুয়ারি দুপুরের আগে প্রধান বিচারপতি শপথবাক্য না পড়ালে জোর করে হোয়াইট হাউসে বসে থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকবেন না, আইনের দৃষ্টিতে অনুবেশকারী বলেই বিবেচিত হবেন।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর।

দৈনিক প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত

ফেসবুকে লাইক দিন

আর্কাইভ

নভেম্বর ২০২০
শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
« অক্টোবর  
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০ 

সর্বমোট ভিজিটর

counter
এই সাইটের কোন লেখা অনুমতি ছাড়া কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ!