বিবাহের আগে জেনে নিন বিবাহের ও কাবিন নামার টুকিটাকি

কাজী মহিবুল্লাহ আযাদ, আমাদের ভোলা.কম।

বিয়েকে অনেকে অনেকভাবে সঙ্গায়িত করতে পারেন।
আমার মতে বিয়ে হলো-
নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধভাবে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ও সন্তান জন্মদানের সমাজস্বীকৃত, আইনসঙ্গত ও ধর্মীয় উপায়।
হিন্দু আইনানুযায়ী বিয়েকে একটি ধর্মীয় আচার বা পূজনীয় অনুষ্ঠান বলা হলেও মুসলিম আইনানুযায়ী বিয়ে একটি দেওয়ানী চুক্তি। অন্যান্য দেওয়ানী চুক্তিতে যেমন প্রথম পক্ষ, দ্বিতীয় পক্ষ থাকে ও চুক্তির শর্ত সম্বলিত চুক্তিনামায় পক্ষদ্বয়ের ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর থাকে মুসলিম বিয়ের চুক্তিপত্রেও তাই থাকে। মুসলিম বিয়েতে যে চুক্তিনামা হয় তাকে বলা হয় কাবিননামা। এতে বর, কনে ও সাক্ষীরা স্বাক্ষর প্রদান করেন। তার মানে অন্যান্য দেওয়ানী চুক্তি যেমন উভয়পক্ষ পড়ে, বারবার দেখে, চুক্তির শর্তের বিশ্লেষণ করে স্বাক্ষর করেন বিয়ের কাবিননামায়ও তাই হওয়া উচিত!

এ প্রসঙ্গে একটি বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এক ব্যক্তি বাড়ি তৈরীতে কী রড ব্যবহার করবেন তা নিয়ে আরেক ব্যক্তির সাথে কথা বলছিলেন। ঐ ব্যক্তি বাড়ি তৈরীতে সাধারণ রড ব্যবহার করলেই চলে ও পদ্মা সেতু বৃহত্তম প্রকল্প বলে সেখানে সেরা রড ব্যবহার করা যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন। জবাবে বাড়ি তৈরী করতে চাওয়া ব্যক্তি দৃপ্তকণ্ঠে বলেন “আমার বাড়ি আমার কাছে পদ্মা সেতু!” প্রশ্ন হলো আমরা বিয়ে করার সময় বিয়েটাকে পদ্মাসেতুর মত বৃহত্তম ঘটনা মনে করছি নাকি বাড়ি তৈরীতে সাধারণ রড তত্ত্ব মেনে নিয়ে কেবল কাবিননামায় যেনতেন ভাবে স্বাক্ষর করছি?

আমি মনেকরি যেকোন চুক্তিপত্রই মনযোগ দিয়ে পড়ে স্বাক্ষর করা উচিত। সংসার হলো সারাজীবনের একটি বন্ধন। যে সম্পর্কের স্থায়িত্ব আমরণ থাকবে এমন প্রত্যাশায় আমরা চুক্তি করি তার সবকিছু কতোটা দায়িত্ব নিয়ে দেখা উচিত তা অনুধাবন করা জরুরি। বিয়ে করতে দুটো পক্ষ আবশ্যক। বর ও কনেপক্ষ কারো প্রতিই পক্ষপাতমূলক বক্তব্য আমার লেখার উদ্দেশ্য নয়। আগেই ডিস্কলেমার দিয়ে কাবিননামার কয়েকটি কলামের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক –

কাবিননামার ১-১২ নং কলাম পর্যন্ত বর, কনে, বিয়ের উকিল, স্বাক্ষীদের নাম ঠিকানা ইত্যাদি থাকে। ১৩ নং কলাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দেনমোহরের পরিমাণ উল্লেখ আছে। এ কলামটিকেই কাবিননামার প্রাণ বলা চলে। এখানে মোহরানার পরিমাণ যা উল্লেখ থাকবে উসুল বাদ তা বর কর্তৃক কনেকে বিবাহবিচ্ছেদ হলে অবশ্যই প্রদান করতে হবে। যদিও এটা ধর্মীয় আইনানুযায়ী বিয়ের সময়ই প্রদান করা উচিত তথাপি আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থায় তা প্রদান করা হয়না বললেই চলে। মোহরানা নির্ধারণে কনের শিক্ষাগত যোগ্যতা,পারিবারিক অবস্থান, বরের অর্থনৈতিক অবস্থা, কনের ফুফু খালা নিকটাত্মীয়দের মোহরানার পরিমাণ ইত্যাদি বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু আজকাল দেখা যাচ্ছে মোহরানার পরিমাণ লাগামহীন ঘোড়ার মত ছুটেই চলেছে। আমার এক শ্যালিকার বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত। কাবিনের পরিমাণ শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গিয়েছে। দেখি আপনাদের চোখে জায়গামত থাকে কিনা! ৩০ লাখ টাকা! উসুল ৫ লাখ টাকা। তার মানে আল্লাহ না করুক তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হলে বরকে শুধু মোহরানা বাবদ পরিশোধ করতে হবে ২৫ লাখ টাকা!

যতদূর জানি আমার হবু ভায়রা ভাই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরিরত। তিনি কোন বিবেচনায় এ বিশাল অংকের মোহরানার প্রস্তাবে সম্মত হলেন তা আমার কাছে এক বিস্ময়! আমি সাধারণ চাকুরে। সারামাসের খরচ যোগানের পর কত বছর জমিয়ে ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা সম্ভব তা ভাবতে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে! এর উল্টো ঘটনাও ঘটে। অনেক সময় মেয়েরা প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে প্রেমিককে নিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে নামমাত্র দেনমোহরেই বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়। কাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রেমিককে দেখিয়ে বলেছিলো ১ টাকা কাবিনে সে বিয়ে করতে চায়! পরে কাজীর জোরাজুরিতে পঞ্চাশ হাজার টাকায় বিয়ে করতে সম্মত হয়।
উল্লেখ্য তাতেও উসুল ছিলো বিশ হাজার টাকা! বিয়ের দেড় বছরের মাথায় সে বিয়ে ভেঙ্গে যায়। বিশ হাজার টাকা উসুল বাদ ত্রিশ হাজার টাকা বর থেকে পেয়েছে কিনা সে প্রশ্ন করার প্রয়োজন আমার হয়নি! আমার যে মেয়েটি ১ টাকা দেনমোহরে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখেছিলো এখন সে ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে সারাজীবন থাকার জন্য একটা খাট কিনতে পারবে বলেও মনে হয়না!

সুতরাং মেয়েরা বর্তমান বাজার বিবেচনা করে দেনমোহর দাবি করুন আর ছেলেরা নিজের সামর্থ্যানুযায়ী দেনমোহর দেবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। যা দেয়ার সামর্থ্য নেই তা প্রদান করার চুক্তিতে আবদ্ধ হবেন কেনো? পরে এ দেনমোহর হবে গলার কাঁটার চেয়েও ভয়ংকর! তাই নিজের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে দেনমোহর প্রদানে সম্মত হোন।

কাবিননামার ১৫ নং কলামে আছে “বিবাহের সময় দেনমোহরের কোন অংশ পরিশোধ করা হয়েছে কিনা? উসুল প্রদানের ঘরে দেখুন যা লেখা আছে তা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত কিনা? আপনি দশ ভরি অলংকার দেয়ার পর উসুল মাত্র দুই লাখ টাকা লেখা হয়েছে কিনা কিংবা মেয়ে মাত্র তিনভরি গহনা পাওয়ার পর উসুল তিন লাখ টাকা লেখা কিনা তা ভালোভাবে দেখে নিন। মনে রাখবেন ১৩ নাম্বার কলামে উল্লেখিত দেনমোহর থেকে শুধু এ অংকটাই বাদ যাবে। কাবিননামার ২০ নং কলামের ঘরটির গুরুত্বও কিন্তু কম নয়! এ ঘরে স্বামী ও স্ত্রী যদি একসাথে না থাকে তবে স্বামী কত টাকা মাসিক খোরপোষ দিবেন তা উল্লেখ থাকে। আমি এমনও দেখেছি একজন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বিয়ে করেছেন আর কাবিনের ২০ নং কলামে ১০ হাজার টাকা মাসিক খোরপোষ প্রদান করবেন মর্মে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেছেন! আমার প্রশ্ন হলো ঐ ব্যক্তি যে বেতন পান তাতে মাসিক ১০ হাজার টাকা খোরপোষ প্রদান করারর সামর্থ্য তার আছে কিনা? আবার অনেক মেয়ে না বুঝে মাসিক ১ হাজার টাকা খোরপোষ প্রদানের কথা উল্লেখ থাকলে তাতেও স্বাক্ষর করেন ! ১০ হাজার টাকা যেমন সব পেশার মানুষের জন্য প্রদান করা বাস্তবসম্মত নয় তেমনি এ বাজারে মাসিক মাত্র ১ হাজার টাকায় একজন নারীর বেঁচে থাকাও সম্ভব নয়।

সুতরাং এ ঘরে সময়োপযোগী লেখাই উত্তম। আদালত উভয়ের অবস্থা বিবেচনা করে যৌক্তিক অংকই নির্ধারণ করবেন। কাবিননামার এ তিনটি কলামই সতর্কতার সাথে বিবেচনা করুন। আপনি বলতে পারেন এত হিসেব করে কী আর জীবন চলে! বিয়ে মানে মনের মিল। সংসারে সুখ থাকলে এগুলো কোন বিষয়ই না। একটা গল্প বলে শেষ করি। আপনি হয়তো ভাববেন দেনমোহর কম বেশি বিষয় না। মৃত্যু পর্যন্ত আমরা এক থাকবো। কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবো না। ভেবে দেখুন তো যদি তা না হয়! সক্রেটিসের একটা গল্প বলি ( ভুল হলে ক্ষমা করবেন)। এক সুন্দরী তাকে বিয়ে করতে চায়। সক্রেটিস দেখতে ভালো ছিলেন না। সে নারী বলেছিলো তুমি আর আমি বিয়ে করলে আমাদের সন্তান হবে আমার মতই সুন্দর আর তোমার মতই জ্ঞানী। সক্রেটিস বলেছিলেন “যদি তার উল্টো হয়! ”

সুতরাং আপনার ক্ষেত্রে উল্টো হবেনা সে নিশ্চয়তা কে দেবে? উল্টো হলে আদালতের বারান্দায় বারান্দায় আপনাকে ঘুরতে হবে। তাই আগেই সতর্ক হোন। আবেগ নয় বিবেক দিয়ে চিন্তা করে কাবিননামায় জেনে বুঝে পড়ে স্বাক্ষর করুন।

বাড়ি করতে যদি ফ্ল্যাট ডেভেলপারের সাথে চুক্তিপত্র এত মনযোগ দিয়ে পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে নিজেদের সুখের ঘর গড়তে এতটুকু সচেতন হবেন না! শেষ করার আগে দুটো কথা বলি এই যে ডাক্তার আকাশরা কাবিনের চাপে পরকীয়া করা স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেনি তা ভুলে গেলে চলবেনা। আবার আমাদের গ্রাম, মফস্বলের অনেক মেয়েকে সামান্য কাবিনের টাকা পরিশোধ করে শুধু ভোগের বস্তু বানাতে যে একশ্রেণির পুরুষ কুন্ঠাবোধ করে না তাও নিশ্চয়ই আপনাদের অজানা নয়। সুতরাং দেখুন, পড়ুন, বুঝুন আর না বুঝলে আবার দেখুন,পড়ুন, বুঝুন তারপর স্বাক্ষর করুন।
আপনারা সুখী হোন।

কাজী মহিববুল্লাহ আজাদ।
নিকাহ রেজিস্ট্রার
৭ নং শিবপুর ইউনিয়ন,
ভোলা সদর, ভোলা।
01715211828

ফেসবুকে লাইক দিন

আর্কাইভ

সেপ্টেম্বর ২০১৯
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০  

সর্বমোট ভিজিটর

counter
এই সাইটের কোন লেখা অনুমতি ছাড়া কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ!
দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।